Saturday, March 7, 2026
No menu items!
spot_img
Homeবাংলাদেশবাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগকে যেভাবে বিতাড়িত করেছে, ঠিক তেমনই কি বিএনপি জামায়াতকেও...

বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগকে যেভাবে বিতাড়িত করেছে, ঠিক তেমনই কি বিএনপি জামায়াতকেও বিতাড়িত করবে?

বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা শুধু পুরনো দলের পরিবর্তন নয় বরং নীতিগত পরিবর্তন চায়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা চায়। তাই বিএনপি হোক আর জামায়াত হোক, যে দলই জনগণের  সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে, জনগণ এক সময় তাদেরকেও বিতাড়িত করবে, ঠিক যেভাবে অতীতে অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি গত কয়েক দশক ধরে মূলত দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে, দল দুটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই দুই দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল, বিরোধিতা এবং কখনো কখনো ঐক্য গঠনের চেষ্টাও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের জনগণের মধ্যে একটি ভিন্ন মনোভাব দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি আসলে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ, তাদের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতির অভিযোগ, গণতন্ত্রহীনতা এবং দলীয় স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়ার প্রবণতা সবকিছুতেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত  আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় ছিল। শুরুতে উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, বিচারব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধতা ও একতরফা নির্বাচনের কারণে দলটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, দেশ কার্যত গণতন্ত্রবিচ্যুত শাসনব্যবস্থার অধীনে চলেছিল। এসব কারণে জনগণের একটি বিশাল অংশ আওয়ামী লীগকে ‘বিতাড়িত’ করার মত রাজনৈতিক মনোভাব পোষণ করে সুযোগে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তুলে তাদেরকে বিতাড়িত করেছে ২০২৪ সালে, শেষ মেশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের ৩০০ এমপি সহ তাদের বলয়ে থাকা সকল নেতা ও সাথে প্রশাসনে যারা তাদেরকে সহযোগিতা করেছিল সকলেই একযোগে দেশ থেকে পালিয়েছে কিংবা দেশে লুকিয়ে আছে।

অন্যদিকে, বিএনপি ২০০১ সালের পর আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারেনি। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচানোর’ আন্দোলনে নেমেছিল, এবং ২০১৮ সালেও তারা ব্যাপকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, তবে দলটি জনগণের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। তার একটি বড় কারণ হলো, বিএনপির অতীত শাসনকালও ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কেউ কেউ জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য দায়ী বলে মনে করে। দলীয় নেতৃত্বে স্থবিরতা, আধুনিক রাজনীতির অভাব, এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের দুর্বলতাও তাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করেছে।

এমতাবস্থায় দেশের বহু নাগরিক আজ প্রশ্ন করেন, আসলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? যেখানে দুটি দলই ক্ষমতায় গেলে একই ধরণের সুবিধাবাদ, কর্তৃত্ববাদ এবং দলীয় দুর্নীতি দেখা যায়, সেখানে নতুন নেতৃত্ব বা বিকল্প শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তরুণ ও সচেতন ভোটাররা। এই কারণেই কেউ কেউ মনে করছেন, যদি আওয়ামী লীগকে জনগণ একদিন বিতাড়িত করে থাকে, তাহলে বিএনপিকেও একই কারণে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। শুধুমাত্র “আওয়ামী লীগবিরোধী” হলেই বিএনপি জনগণের আস্থা পাবে এমন ভাবনা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এবার আসি জামায়াত ইসলামীর দিকে, জামায়াতে ইসলামী একসময় ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। তবে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পর তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও সংগঠনের নিষিদ্ধ সম্ভাবনার কারণে দলটি কার্যত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরে জামায়াত নতুন করে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাঠে নেমেছে। দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে রাজনীতিতে সার্বিক ভাবে সক্রিয় থাকছে। ইতিমধ্যে তাড়া ২৫০ আসনের প্রার্থীতালিকাও চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তারা মনে করছে মাঠে একক দল হিসেবে জনগণের মধ্যে তাদের আস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। তারা  বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে আগামী নির্বাচনে তাড়া একটি শক্ত অবস্থানে থাকবে এমনকি ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যাবে, যদিও বিশ্লেষকদের মতে এটি জামায়াতের একটি অলীক কল্পনা, দেশের ৯০% মানুষ মুসলিম হলেও বেশীরভাগ মানুষ মুসলিম হিসেবে অনেকটা সেকুলার বা প্রগতিশীল মুসলিম। যে কারণে একক ভাবে জামায়াতের একক ভাবে ক্ষমতায় আসা খুবই দুরূহ ব্যাপার। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে জামায়াতের ধর্মীয় কট্টরতা ও যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস একটি নেতিবাচক ছাপ এখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। 

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় কোণ শক্তিকে পছন্দ করবে? বর্তমানে কিছু নতুন রাজনৈতিক শক্তি যেমন এবি পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণতন্ত্র মঞ্চ, সদ্য গঠিত এনসিপি অথবা বিভিন্ন প্রগতিশীল গোষ্ঠী একটি বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা গঠনের চেষ্টা করছে। যদিও তারা এখনো জনগণের বিস্তৃত আস্থা অর্জন করতে পারেনি, তবে ভবিষ্যতের রাজনীতি সম্ভবত এই পুরাতন দুই শক্তির বাইরে আরও কিছু দেখবে, যদি না তারা নিজেরাই ব্যাপক আত্মপর্যালোচনা ও সংস্কারের পথে না হাঁটে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা শুধু পুরনো দলের পরিবর্তন নয় বরং নীতিগত পরিবর্তন চায়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা চায়। তাই বিএনপি হোক আর জামায়াত হোক, যে দলই জনগণের  সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে, জনগণ এক সময় তাদেরকেও বিতাড়িত করবে, ঠিক যেভাবে অতীতে অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments