১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেটি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল। এই গণঅভ্যুত্থান ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় আন্দোলন।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ছয় দফা দাবি ছিল এই আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি। ছয় দফায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সরকার এই দাবিগুলো অগ্রাহ্য করে এবং রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দমননীতি চালায়। এর মধ্যে: শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের কারাবন্দি করা, মানুষের ওপর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর দমনপীড়ন, এবং সত্তরের দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ।
এসব কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ওঠে। ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যু ছাত্র ও জনসাধারণকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ২৪ জানুয়ারি সারাদেশে ধর্মঘট ডাকা হয়, যা গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এই দিনে ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, যাতে বেশ কিছু মানুষ প্রাণ হারায়।
এই গণঅভ্যুত্থানের ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সরকার, কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতারা মুক্তি পান, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি উপেক্ষা করতে না পেরে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
এই গণঅভ্যুত্থান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দেখিয়ে দেয় যে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে দমন-পীড়নের শাসনের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের শক্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করে।