সম্পাদকীয়ঃ ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিচে উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. ডামি নির্বাচনঃ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিরোধী দলগুলো “ডামি নির্বাচন” হিসেবে অভিহিত করে। তাদের অভিযোগ ছিল যে, নির্বাচনটি ছিল প্রহসনমূলক এবং এতে ভোটারদের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয়নি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। বিরোধী দলগুলোর বয়কট এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২. ভারতীয় পণ্য বয়কটঃ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন মহলে ভারতের প্রতি অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। বিরোধী দল ও সামাজিক সংগঠনগুলো ভারতের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সমালোচনা করে এবং ‘ভারতীয় পণ্য বয়কট’ আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে জনগণ ভারতীয় পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়।
৩. শত্রু চিহ্নিতকরণ: (ভারত, প্রথম আলো এবং আওয়ামী লীগ) ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু গোষ্ঠী ভারত, প্রথম আলো পত্রিকা এবং আওয়ামী লীগকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের দাবি ছিল যে, এই তিনটি সত্তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। এ ধরনের চিহ্নিতকরণ রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তোলে।
৪. অধিকারের রাজনীতির বিকাশঃ ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে আন্দোলন জোরদার হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই সময়ে অধিকারের রাজনীতির বিকাশ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
৫. স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পুনরায় চাহিদাঃ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কিছু গোষ্ঠী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল চেতনা ও মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের দাবি তোলে। তাদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, এবং তাই ঘোষণাপত্রের মূলনীতি পুনরায় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন।
৬. গণঅভ্যুত্থান / আগস্ট বিপ্লবঃ জুলাই-আগস্ট মাসে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যা “আগস্ট বিপ্লব” নামে পরিচিতি পায়। শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে এই আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। সরকারবিরোধী এই আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
৭. ১৬ বছরের ফ্যাসিস্টের পতনঃ বিরোধী দল ও সমালোচকরা শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলকে “ফ্যাসিবাদী” শাসন হিসেবে অভিহিত করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই দীর্ঘ শাসনামলের অবসান ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৮. নোবেলজয়ী ড. ইউনুসের ক্ষমতা গ্রহণঃ শেখ হাসিনার পতনের পর, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু হয়।
৯. অর্থনৈতিক সংকটঃ ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঘাটতি দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর প্রকল্পগুলো জোরদার হয় এবং ই-শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়।
উপরোক্ত ঘটনাগুলো ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলেছে।