রাজা গোলাম রাব্বানীঃ রাশিয়ান লেখক আন্তন চেখভ বলেছেন, “সবার যেমন একটি করে পশ্চাতদেশ থাকে। ঠিক তেমনি ব্যর্থ সমাজে যে কোনো বিষয়ের উপর সবার একটি করে মতামতও থাকে। ব্যর্থ সমাজে মানুষ ব্যর্থ হয়না, এখানে সচতুরভাবে তাকে ব্যর্থ বানানো হয়।“ এই বিষয়টি বিভিন্ন ভাবে বুঝতে চেষ্টা করলাম গত দুই দিন, অবশেষে একটি প্রতিবেদনই হয়ে গেল।
আমার মতে লেখক আন্তন উক্তিটির মাধ্যমে সমাজের ব্যর্থতার কারণ এবং মানুষের অবস্থানের উপর আলোকপাত করেছেন। আমার মনে হয়েছে এটি একটি বিশ্লেষণমূলক বক্তব্য যা সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোকে তুলে ধরে।
মতামত এবং পশ্চাতদেশের তুলনা করতে যেয়ে চেখভ রূপক অর্থে বোঝাতে চেয়েছেন যে, যেমন প্রত্যেকের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি অংশ হিসাবে পশ্চাতদেশ থাকে, তেমনই সমাজে প্রত্যেকের একটি করে মতামত থাকে। তবে এই মতামত প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক, অযাচিত, বা গুরুত্বহীন হয়। একটি ব্যর্থ সমাজে, অধিকাংশ মতামত বাস্তবসম্মত কিংবা গঠনমূলক না হয়ে, শুধুমাত্র সমালোচনা বা কুৎসা রচনার কাজে ব্যবহৃত হয় এর ফলে সমস্যার সমাধান না হয়ে, আরও জটিলতা তৈরি হয়।
আমি মনে করি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বনাম সামাজিক ব্যর্থতা এই ক্ষেত্রে অনেক সময় এক করে দেখা হয় কিন্তু চেখভ বলেছেন, মানুষ ব্যর্থ হয় না, বরং তাকে ব্যর্থ বানানো হয়। এর মানে হলো,সমাজে ক্ষমতাবান শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনভাবে সাধারণ মানুষের সম্ভাবনাকে দমন করে।সামাজিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয় যে, মানুষ নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হয়। উদাহরণস্বরূপ, অনৈতিক রাজনীতি, বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অসমতা মানুষের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এখন আমরা যদি দেখি আসলে এখানে ব্যর্থ সমাজ বলতে কি বোঝান হয়েছে? তাহলে দেখবো একটি ব্যর্থ সমাজে বিচার, নৈতিকতা, এবং সংস্কৃতি প্রায়ই বিকৃত হয়। এখানে জ্ঞান ও কর্মের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, অন্যদিকে, যে কোনো নতুন বা মৌলিক ধারণাকে অপমান বা অবহেলা করা হয়। গত কয়েকদিনে আমি সেই বাস্তব অবস্থার সাথে মোকাবেলা করেছি,
মিস্টার চেখব ছিলেন একজন মানবতাবাদী লেখক, যিনি সমাজের ত্রুটি ও অসঙ্গতিগুলোকে রচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এই উক্তি তার লেখার গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করে। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি মুক্ত চিন্তা ও সৃজনশীলতার সুযোগ পায়, তবে তাদের ব্যর্থ হতে হবে না, কিন্তু, সমাজ যদি মানুষকে ব্যর্থ হতে বাধ্য করে, তবে এর পেছনে বড় কারণ হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা।
এখন আমি যদি চেখবের উক্তি ধরে আজকের সমাজেকে দেখার চেষ্টা করি তাহলে দেখবো আধুনিক প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রত্যেকের মতামত দেওয়া সহজ হয়ে গেছে। তবে এই মতামতগুলোর একটি বড় অংশ দায়িত্বশীল নয়, সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এখনো মানুষের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করছে, ফলে, মানুষের প্রকৃত ব্যর্থতার চেয়ে, তাদের ব্যর্থ করে তোলার প্রচেষ্টা বেশি দেখা যায়।
আন্তন চেখভের এই উক্তি আমাদের সমাজ ও নিজের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। এটি শুধু সমালোচনা নয়, বরং একটি আহ্বান যে, আমরা যেন সমাজকে এমন জায়গায় নিয়ে যাই, যেখানে প্রত্যেকে নিজের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে।